নিজস্ব প্রতিবেদন (লাইফস্টাইল ডেস্ক):
সকালের জলখাবার হোক বা বিকেলের টিফিন ডিম ছাড়া বাঙালির দিন চলা প্রায় অসম্ভব। আট থেকে আশি, সবার কাছেই প্রোটিনের সবচেয়ে সহজ এবং সস্তা উৎস হলো ডিম। কিন্তু স্বাস্থ্য সচেতনতা বা ফিটনেস ট্রেন্ডের চক্করে পড়ে বর্তমানে একটি অদ্ভুত অভ্যাস তৈরি হয়েছে। অনেকেই ওজন বাড়ার বা কোলেস্টেরল বাড়ার ভয়ে ডিমের হলুদ অংশ অর্থাৎ কুসুমটা সযত্নে ডাস্টবিনে ফেলে দেন এবং শুধুমাত্র সাদা অংশটুকু খান। জিম করা তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বয়স্ক মানুষ, সবার মনেই একটা ভয়, কুসুম খেলেই নাকি হু হু করে ওজন বাড়বে আর হার্টের বারোটা বাজবে! কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং পুষ্টিবিদরা কী বলছেন? ডিমের কুসুম ফেলে দিয়ে আপনি কি সত্যিই লাভবান হচ্ছেন, নাকি নিজের চরম ক্ষতি করছেন? চলুন, আজ এই বহুল প্রচলিত ভুল ধারণাটি ভেঙে ফেলা যাক।
কুসুম বাদ দিলে আসলে কী হারায়?
ডিমের দুটি অংশ সাদা অংশ এবং কুসুম। এটা ঠিক যে ডিমের সাদা অংশে ভরপুর প্রোটিন থাকে এবং এতে ফ্যাট বা ক্যালোরি প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু ডিমের আসল জাদুকরী পুষ্টিগুণ লুকিয়ে থাকে ওই হলুদ কুসুমের মধ্যেই। আপনি যখনই কুসুমটা ফেলে দিচ্ছেন, তখন আপনি প্রোটিন ছাড়া ডিমের বাকি সমস্ত ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থ থেকে শরীরকে বঞ্চিত করছেন। পুষ্টিবিদদের মতে, আস্ত ডিম হলো ‘সুপারফুড’, কিন্তু কুসুম ছাড়া ডিমের পুষ্টিগুণ একেবারেই অসম্পূর্ণ।
কুসুমের পুষ্টিগুণ: এক নজরে জাদুকরী উপাদান
ডিমের কুসুমকে পুষ্টির পাওয়ার হাউস বলা হয়। এতে এমন কিছু বিরল ভিটামিন এবং মিনারেলস রয়েছে, যা অন্য সাধারণ খাবারে খুব একটা পাওয়া যায় না।
প্রথমত, কুসুমে রয়েছে ভিটামিন এ, ডি, ই এবং কে। এর মধ্যে ভিটামিন ডি আমাদের হাড় মজবুত করতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। প্রাকৃতিকভাবে যে কয়েকটি খাবারে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়, ডিমের কুসুম তার মধ্যে অন্যতম।
দ্বিতীয়ত, চোখের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি দুটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট লুটেইন এবং জিয়াজ্যান্থিন প্রচুর পরিমাণে থাকে এই হলুদ অংশে। এগুলো বয়সজনিত চোখের সমস্যা এবং ছানি পড়া রোধ করে।
তৃতীয়ত, কুসুমে রয়েছে কোলিন নামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা মস্তিষ্কের বিকাশ এবং স্নায়ুতন্ত্রকে সুস্থ রাখতে ম্যাজিকের মতো কাজ করে। বিশেষ করে শিশুদের স্মৃতিশক্তি বাড়াতে কোলিন অপরিহার্য।
কোলেস্টেরল আর হার্টের সমস্যার ভয় কি অমূলক?
ডিমের কুসুম নিয়ে সবচেয়ে বড় বদনাম হলো এর কোলেস্টেরল। একটি বড় ডিমের কুসুমে প্রায় ১৮৬ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল থাকে। আগে মনে করা হতো, খাবারে থাকা কোলেস্টেরল সরাসরি রক্তের কোলেস্টেরল বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং একাধিক গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
খাবারের কোলেস্টেরলের সাথে রক্তে থাকা ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের (LDL) সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। বরং, আমাদের যকৃৎ বা লিভার নিজেই শরীরে কোলেস্টেরল তৈরি করে। আপনি যদি বাইরের খাবার থেকে কোলেস্টেরল কম খান, তবে লিভার বেশি করে কোলেস্টেরল তৈরি করে সেই ঘাটতি মেটায়। আর ডিমের কুসুমে যে ফ্যাট থাকে, তা মূলত আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট বা ‘গুড ফ্যাট’, যা শরীরের জন্য উপকারী এবং এটি রক্তে ভালো কোলেস্টেরলের (HDL) মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে।
ওজন কমাতে কি কুসুম বাধা দেয়?
একেবারেই নয়! বরং আস্ত ডিম খেলে অনেকক্ষণ পেট ভরা থাকে, ফলে বারবার খাওয়ার ক্রেভিং বা ইচ্ছে কমে যায়। এটি পরোক্ষভাবে ওজন কমাতেই সাহায্য করে। কুসুমে থাকা স্বাস্থ্যকর ফ্যাট মেটাবলিজম বাড়াতেও কার্যকরী। তাই ডায়েটে থাকলেও কুসুম বাদ দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
দিনে কয়টি ডিমের কুসুম খাওয়া নিরাপদ?
একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ প্রতিদিন অনায়াসে ১ থেকে ২টি আস্ত ডিম (কুসুম সমেত) খেতে পারেন। এতে হার্টের কোনো ক্ষতি হয় না, বরং শরীরের পুষ্টির ঘাটতি মেটে। তবে যাদের আগে থেকেই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হার্টের গুরুতর সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ডিম খাওয়া উচিত। অনেক ক্ষেত্রে ডাক্তাররা রোগীদের সপ্তাহে ৩-৪টি কুসুম খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
উপসংহার:
প্রকৃতি ডিমকে একটি সম্পূর্ণ খাবার হিসেবেই তৈরি করেছে। বিজ্ঞানের অসম্পূর্ণ ধারণার বশবর্তী হয়ে এর সবচেয়ে উপকারী অংশটি ফেলে দেওয়া মানে টাকার অপচয় এবং স্বাস্থ্যের ক্ষতি। তাই এরপর থেকে ডিম খাওয়ার সময় কোনো অপরাধবোধ ছাড়াই কুসুম সমেত আস্ত ডিম খান। পরিমিত মাত্রায় খেলে ডিমের কুসুম আপনার কোনো ক্ষতি তো করবেই না, উল্টে আপনাকে রাখবে সুস্থ, সতেজ ও প্রাণবন্ত।
