এক নজরে (Highlights):
- দেশজুড়ে বইছে তীব্র তাপপ্রবাহ, ঘরে-বাইরে বাড়ছে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতার ঝুঁকি।
- গরমে শরীর সতেজ ও রোগমুক্ত রাখতে ওষুধের চেয়েও বেশি কার্যকরী দেশীয় মৌসুমি ফল।
- তরমুজ, আম, বাঙ্গি ও বেলের মতো ফলের পুষ্টিগুণ নিমিষেই দূর করে শারীরিক ক্লান্তি।
- হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কোন ফলগুলো রাখবেন? জানুন বিস্তারিত।
মূল প্রতিবেদন:
গ্রীষ্মকাল মানেই রোদের প্রখরতা আর ভ্যাপসা গরমের দাপট। অতিরিক্ত ঘামের কারণে এই সময়ে শরীরে দেখা দেয় চরম ক্লান্তি এবং পানিশূন্যতা (Dehydration)। তবে প্রকৃতির এক অদ্ভুত নিয়ম হলো, ঋতুভেদে যখন যে সমস্যা দেখা দেয়, তার সমাধানও প্রকৃতি নিজেই নিয়ে আসে। গ্রীষ্মের এই খরতাপ থেকে শরীরকে বাঁচাতে বাজারে আসতে শুরু করেছে নানা রকম রসালো ও সুস্বাদু ফল।
চিকিৎসকদের মতে, গরমের সময়ে শরীর সুস্থ ও সতেজ রাখতে কৃত্রিম এনার্জি ড্রিংকস বা কোমল পানীয়ের চেয়ে প্রাকৃতিক মৌসুমি ফলের কোনো বিকল্প নেই। এগুলো কেবল শরীরে পানির ঘাটতিই মেটায় না, বরং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকিও কমায়।
চলুন জেনে নিই, এই তীব্র গরমে সুস্থ থাকতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কোন ফলগুলো রাখা অত্যন্ত জরুরি:
১. তরমুজ: পানিশূন্যতা রোধের সেরা হাতিয়ার
গরমের ফলের কথা উঠলেই সবার আগে আসে তরমুজের নাম। তরমুজের প্রায় ৯২ শতাংশই পানি, যা শরীরের পানিশূন্যতা দূর করতে জাদুর মতো কাজ করে। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, বি৬, সি এবং পটাশিয়াম। তরমুজে থাকা ‘লাইকোপেন’ নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রোদের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে ত্বককে রক্ষা করে। প্রতিদিন এক বাটি তরমুজ খেলে শরীরের ক্লান্তি দূর হয় এবং হৃদযন্ত্র সুস্থ থাকে।
২. কাঁচা ও পাকা আম: পুষ্টি ও স্বাদের রাজা
গ্রীষ্মকালকে ফলের ঋতু বলা হয় মূলত আমের কারণেই। স্বাদে ও পুষ্টিতে ভরপুর আমকে বলা হয় ফলের রাজা। তীব্র গরমে কাঁচা আমের শরবত শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে পাকা আমে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, সি এবং ফাইবার, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, চোখের জ্যোতি ভালো রাখে এবং হজমশক্তি উন্নত করে।
৩. বাঙ্গি: সস্তায় পুষ্টি ও শরীর ঠান্ডা রাখার মহৌষধ
অনেকেই বাঙ্গির স্বাদ খুব একটা পছন্দ করেন না, কিন্তু পুষ্টিগুণের দিক থেকে এটি অন্যতম সেরা একটি ফল। বাঙ্গিতে ক্যালরির পরিমাণ একেবারেই কম, কিন্তু পানির পরিমাণ অনেক বেশি। যারা ডায়াবেটিসে ভুগছেন কিংবা ওজন কমাতে চান, তাদের জন্য বাঙ্গি একটি আদর্শ ফল। এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং শরীরকে ভেতর থেকে দীর্ঘক্ষণ ঠান্ডা রাখে।
৪. বেল: পেটের সমস্যা ও হজমশক্তির পরম বন্ধু
গরমে পেটের নানা রকম সমস্যা বাড়ে। এই সময়ে এক গ্লাস বেলের শরবত পেটের জন্য অমৃতের মতো কাজ করে। বেলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস। এটি দীর্ঘমেয়াদি আমাশয়, ডায়রিয়া এবং কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময়ে দারুণ কার্যকরী। রোদের তাপ থেকে ফিরে বেলের শরবত খেলে শরীরের ক্লান্তি নিমিষেই দূর হয়ে যায়।
৫. লিচু: রসালো সতেজতায় ভরপুর
গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে আসা লিচু কেবল সুস্বাদুই নয়, পুষ্টিগুণেও অনন্য। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখে এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়। তবে লিচুতে গ্লুকোজের পরিমাণ বেশি থাকায় ডায়াবেটিস রোগীদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমিত পরিমাণে লিচু খাওয়া উচিত।
৬. জামরুল ও ডাব: প্রাকৃতিক স্যালাইন
হালকা মিষ্টি স্বাদের পানিসমৃদ্ধ ফল জামরুল গরমে তৃষ্ণা মেটাতে দারুণ কাজ করে। এতে ক্যালরি কম থাকায় এটি ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। এছাড়া ডাবের পানির কথা না বললেই নয়! ডাবের পানিকে বলা হয় ‘প্রাকৃতিক স্যালাইন’। অতিরিক্ত ঘামের ফলে শরীর থেকে যে সোডিয়াম ও পটাশিয়াম বেরিয়ে যায়, ডাবের পানি তা দ্রুত পূরণ করে শরীরকে চনমনে করে তোলে।
চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা (সতর্কতা ও টিপস):
ফল খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা মেনে চলা জরুরি।
- রাস্তার পাশের খোলা ও কাটা ফল কোনোভাবেই খাওয়া যাবে না, এতে ডায়রিয়া বা জন্ডিসের মতো পানিবাহিত রোগ হতে পারে।
- ফল খাওয়ার আগে অন্তত আধা ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখুন।
- ফ্রিজ থেকে বের করেই অতিরিক্ত ঠান্ডা ফল খাবেন না, কিছুক্ষণ স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রেখে তারপর খান।
- ফলের রসের চেয়ে আস্ত ফল চিবিয়ে খাওয়া বেশি উপকারী, কারণ এতে ফাইবার অটুট থাকে।
পরিশেষ:
গরমের তীব্রতা যতই বাড়ুক না কেন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস আপনাকে রাখতে পারে সতেজ ও প্রাণবন্ত। তাই বাইরের অস্বাস্থ্যকর খাবার ও কৃত্রিম পানীয় এড়িয়ে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখুন দেশীয় রসালো ফল। নিজে সুস্থ থাকুন এবং পরিবারের সদস্যদেরও সুরক্ষিত রাখুন।
