নিজস্ব প্রতিবেদন (ট্রাভেল ডেস্ক):
সপ্তাহের পাঁচ দিন একটানা অফিস, ল্যাপটপ আর ট্রাফিকের জ্যামে আটকে থাকার পর উইকএন্ড বা ছুটির দিনে মনটা স্বাভাবিকভাবেই একটু প্রকৃতির কাছে হারিয়ে যেতে চায়। অনেকেই ভাবেন মাত্র দু’দিনের ছুটিতে কোথায় বা আর যাওয়া যায়? দিঘা বা পুরীতে তো সবসময় তিল ধারণের জায়গা থাকে না। কিন্তু আপনি কি জানেন, তিলোত্তমা কলকাতা থেকে মাত্র তিন ঘণ্টার দূরত্বেই লুকিয়ে রয়েছে এমন এক অজানা স্বর্গরাজ্য, যাকে দেখলে আপনার মনে হবে যেন সুদূর ব্রাজিলের ‘আমাজন’ জঙ্গলে এসে পড়েছেন? হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন! কোনো রূপকথার গল্প নয়, খাস বাংলার বুকেই রয়েছে এক ‘মিনি আমাজন’। যেখানে সবুজের সমারোহ, নদীর বুকে নৌকাবিহার আর নির্জনতা আপনার সমস্ত ক্লান্তি নিমেষেই দূর করে দেবে।
আজ আমরা কথা বলছি দক্ষিণ ২৪ পরগনার বকখালির খুব কাছে অবস্থিত এক অফবিট ডেস্টিনেশন ‘লালগঞ্জ’ নিয়ে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যেই এই জায়গার একাধিক ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হতে শুরু করেছে। পর্যটকদের কাছে এটি বাংলার ‘মিনি আমাজন’ নামেই ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। চলুন জেনে নিই এই অজানা গন্তব্যের খুঁটিনাটি।
কেন লালগঞ্জকে ‘মিনি আমাজন’ বলা হয়?
লালগঞ্জে পা রাখলেই আপনার চোখ জুড়িয়ে যাবে। ইট-কাঠ-পাথরের জঙ্গল ছেড়ে একেবারে খাঁটি প্রকৃতির মাঝে এক অদ্ভুত শান্তির সন্ধান পাবেন এখানে। এখানকার ম্যানগ্রোভ জঙ্গল এতটাই ঘন যে, দিনের বেলাতেও গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো মাটিতে পৌঁছাতে রীতিমতো সংগ্রাম করে। আর এই গহীন সবুজ জঙ্গলের বুক চিরে সাপের মতো এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে একটি নদী।
নদীর দুই পাড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে সুন্দরী, গরান, গেওয়ার মতো সারি সারি ম্যানগ্রোভ গাছ। আপনি চাইলে স্থানীয় মাঝিদের সাহায্যে এখানে নৌকাবিহার বা বোট রাইড করতে পারেন। ইঞ্জিনচালিত নৌকার বদলে যখন দাঁড়ের নৌকায় চড়ে এই নদীর বুক দিয়ে যাবেন, তখন চারপাশের নিস্তব্ধতা এবং জঙ্গলের মোহময়ী রূপ আপনাকে হলিউডের কোনো অ্যাডভেঞ্চার মুভির সেটের কথা মনে করিয়ে দেবে।
সাদা বালুতট এবং লাল কাঁকড়ার অপরূপ সৌন্দর্য
শুধু নদী আর জঙ্গলই নয়, লালগঞ্জের আরও একটি বড় আকর্ষণ হলো এখানকার নির্জন সাদা বালুতট বা সমুদ্র সৈকত। দিঘার মতো এখানে মানুষের কোলাহল নেই। এই নরম সাদা বালুতটে পা রাখলে দেখতে পাবেন হাজার হাজার লাল কাঁকড়ার দল। আপনি একটু এগিয়ে গেলেই তারা সুড়ুৎ করে বালির গর্তে লুকিয়ে পড়বে। জঙ্গল এবং সমুদ্র এই দুইয়ের এমন অদ্ভুত সুন্দর মেলবন্ধন বাংলার খুব কম জায়গাতেই দেখতে পাওয়া যায়।
আশপাশে আর কী কী দেখার রয়েছে?
লালগঞ্জ তো ঘুরবেনই, তবে হাতে যদি আর কিছুটা সময় থাকে, তবে আশেপাশের আরও বেশ কয়েকটি দারুণ জায়গা থেকে ঘুরে আসতে পারেন। লালগঞ্জের খুব কাছেই রয়েছে কালিস্থান সি বিচ। এছাড়া টোটো বা গাড়ি ভাড়া করে সহজেই ঘুরে নিতে পারেন দক্ষিণবঙ্গের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র বকখালি, ফ্রেজারগঞ্জ, হেনরি আইল্যান্ড, জম্বু দ্বীপ এবং বেনফিশ হারবার। অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীরা কার্গিল আইল্যান্ড থেকেও এক চক্কর ঘুরে আসতে পারেন।
কীভাবে পৌঁছাবেন এই মিনি আমাজনে?
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই স্বর্গে পৌঁছাতে আপনার পকেটে খুব বেশি টান পড়বে না। কলকাতা থেকে লালগঞ্জের দূরত্ব মাত্র ১২০ কিলোমিটার এবং বকখালি থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার।
ট্রেনে যেতে চাইলে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে নামখানা লোকাল ধরুন। শিয়ালদহ থেকে নামখানা পর্যন্ত ট্রেনের টিকিট মাত্র ২৫ টাকা। এরপর নামখানা স্টেশনে নেমে সেখান থেকে টোটো, অটো বা ম্যাজিক গাড়ি রিজার্ভ করে সরাসরি ২২ কিলোমিটার দূরের লালগঞ্জে পৌঁছে যেতে পারেন। আর যারা একটু পকেট ফ্রেন্ডলি ট্রিপ খুঁজছেন, তারা নামখানা থেকে অনায়াসে শেয়ারের গাড়িতেও এই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন।
এছাড়া আপনি যদি নিজের গাড়ি বা বাইক নিয়ে যেতে চান, তবে ডায়মন্ড হারবার এবং কাকদ্বীপ হয়ে অত্যন্ত সুন্দর ও মসৃণ রাস্তা ধরে মাত্র তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টার মধ্যেই লালগঞ্জে পৌঁছে যেতে পারবেন।
যাওয়ার সেরা সময়
লালগঞ্জ ঘোরার সেরা সময় হলো বর্ষাকাল এবং শীতকাল। বর্ষায় এখানকার জঙ্গলের রূপ যেন ফেটে পড়ে, চারিদিক একদম কচি সবুজ পাতায় ভরে ওঠে। আর শীতে হালকা রোদে নদীর বুকে ঘুরে বেড়ানোর মজাই আলাদা। তবে গরমে গেলেও এখানকার নদীর ঠান্ডা হাওয়া আপনাকে যথেষ্ট স্বস্তি দেবে।
উপসংহার:
রোজকার একঘেয়েমি রুটিন থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে এবং সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে প্রকৃতির সাথে একান্তে কিছু সময় কাটাতে লালগঞ্জ হতে পারে আপনার পরবর্তী উইকএন্ড ডেস্টিনেশন। তাই আর দেরি কেন? আসছে উইকএন্ডেই ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ুন আর নিজের চোখে দেখে আসুন বাংলার এই লুকিয়ে থাকা ‘মিনি আমাজন’।
