নিজস্ব প্রতিবেদন (আবহাওয়া ডেস্ক):
টানা কয়েক সপ্তাহের হাঁসফাঁস গরম, তাপপ্রবাহ আর রোদের তেজ সহ্য করার পর অবশেষে রাজ্যবাসীর জন্য বড়সড় স্বস্তির খবর শোনাল আলিপুর আবহাওয়া দফতর। এপ্রিল মাসের শুরু থেকেই যে হারে তাপমাত্রার পারদ চড়ছিল, তাতে কার্যত নাভিশ্বাস অবস্থা হয়েছিল সাধারণ মানুষের। রোদের দাপটে দিনের বেলায় রাস্তাঘাট প্রায় শুনশান হয়ে যাচ্ছিল। তবে এবার সেই পরিস্থিতির বদল হতে চলেছে। আকাশে জমতে শুরু করেছে কালো মেঘ, আর তার সাথেই বইছে দমকা হাওয়া।
হাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আজ সোমবার (২৭ এপ্রিল) থেকেই কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় আবহাওয়ার আমূল পরিবর্তন হতে চলেছে। তীব্র তাপদাহের পর যে বৃষ্টির জন্য চাতকের মতো অপেক্ষা করছিল গোটা বাংলা, আজ সেই স্বস্তির বৃষ্টির সাথেই ধেয়ে আসছে কালবৈশাখী। তবে এই বৃষ্টি স্বস্তি আনলেও, ঝড়ের দাপট নিয়ে বড়সড় অশনি সংকেত বা অরেঞ্জ অ্যালার্ট জারি করেছে আবহাওয়া দফতর। আপনিও কি আজ বাড়ি থেকে বেরোনোর পরিকল্পনা করছেন? তবে বেরোনোর আগে অবশ্যই জেনে নিন আজকের আবহাওয়ার লেটেস্ট আপডেট।
দক্ষিণবঙ্গে কালবৈশাখী ও শিলাবৃষ্টির সতর্কতা
আলিপুর আবহাওয়া দফতরের তরফ থেকে জারি করা বিশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, আজ সোমবার থেকেই দক্ষিণবঙ্গে নতুন করে দুর্যোগ শুরু হবে। হালকা থেকে মাঝারি পরিমাণে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে নদীয়া, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং মুর্শিদাবাদ জেলায়।
তবে আবহাওয়া দফতর সবচেয়ে বেশি সতর্কতা জারি করেছে বাঁকুড়া এবং পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার জন্য। হাওয়া অফিসের পূর্বাভাস, এই দুই জেলায় ঘণ্টায় ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে ভয়ংকর কালবৈশাখী ঝড় আছড়ে পড়তে পারে, যার সাথে দোসর হতে পারে শিলাবৃষ্টি। এছাড়া অন্যান্য জেলাগুলোতেও ঘণ্টায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া এবং বজ্রপাতের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। দুর্যোগের পরিস্থিতি সামাল দিতে উল্লেখিত এই ৭টি জেলায় আবহাওয়া দফতরের তরফ থেকে ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ বা কমলা সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
কেন এই হঠাৎ দুর্যোগ?
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হঠাৎ ঝড়বৃষ্টির পেছনে রয়েছে একটি জোরালো ঘূর্ণাবর্ত। উত্তর-পূর্ব ঝাড়খন্ড এবং তার সংলগ্ন এলাকার ওপর একটি বায়ুস্তরের ঘূর্ণাবর্ত অবস্থান করছে। এর পাশাপাশি, পূর্ব ভারতের ওপর দিয়ে প্রায় ৮০ নট বেগে শক্তিশালী উপক্রান্তীয় পশ্চিমী জেট স্ট্রিম বা বায়ুপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং একটি নিম্নচাপ অক্ষরেখা সক্রিয় রয়েছে। এই জোড়া ফলার কারণেই বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প ঢুকে বাংলার আকাশে কালবৈশাখীর অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।
উত্তরবঙ্গের আবহাওয়া কেমন থাকবে?
দক্ষিণবঙ্গের পাশাপাশি আজ উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতেও প্রবল দুর্যোগের পূর্বাভাস দিয়েছে হাওয়া অফিস। উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি জেলাগুলোতে বিগত কয়েকদিন ধরেই বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি চলছিল। আজ সেই বৃষ্টির পরিমাণ আরও বাড়বে। ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া এবং বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ভারী বৃষ্টিপাতের জন্য দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং কালিম্পং জেলায় কমলা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এছাড়া কোচবিহার, মালদহ এবং দুই দিনাজপুরেও মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
আগামীকাল, মঙ্গলবার কেমন থাকবে বাংলার আবহাওয়া?
আজকের পর আগামীকাল, অর্থাৎ মঙ্গলবারও এই দুর্যোগ অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে আলিপুর। দক্ষিণবঙ্গের ক্ষেত্রে মঙ্গলবার নদীয়া, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান এবং উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ প্রবল বৃষ্টিপাত এবং কালবৈশাখীর জন্য অরেঞ্জ অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। কলকাতা, হাওড়া এবং হুগলিতেও বিক্ষিপ্তভাবে ঝড়বৃষ্টির দাপট বজায় থাকবে।
অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গের ক্ষেত্রে মঙ্গলবার ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে জলপাইগুড়ি এবং আলিপুরদুয়ার জেলায়। দার্জিলিং, কালিম্পং এবং কোচবিহারেও ভারী বৃষ্টি চলবে।
কী কী সতর্কতা অবলম্বন করবেন?
আবহাওয়া দফতরের তরফ থেকে সাধারণ মানুষকে এই ঝড়বৃষ্টির সময় কিছু বিশেষ সতর্কতা মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
১. যখন ঝড় বা বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি শুরু হবে, তখন কোনোভাবেই ফাঁকা মাঠে বা বড় গাছের নিচে দাঁড়াবেন না।
২. রাস্তায় যাতায়াতকারী গাড়ি চালকদের বলা হয়েছে দৃশ্যমানতা কমে গেলে গাড়ি নিরাপদ স্থানে দাঁড় করিয়ে রাখতে।
৩. বিদ্যুতের খুঁটি বা ছেঁড়া তার থেকে দূরে থাকুন।
উপসংহার:
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই কালবৈশাখী এবং বৃষ্টিপাত দক্ষিণবঙ্গের তাপমাত্রা অনেকটাই কমিয়ে দেবে এবং মানুষের মনে স্বস্তি ফেরাবে। টানা কাঠফাটা গরমের পর এই বৃষ্টি কৃষিকাজের জন্যও অত্যন্ত উপকারী হতে চলেছে। তবে ঝড়ের সময় বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তাপমাত্রার পতন হলেও, বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশি থাকার কারণে বৃষ্টির আগে কিছুটা গুমোট গরম অনুভূত হতে পারে।
