B-28

বন্দে ভারতের রেকর্ডও এবার অতীত! ২৮০ কিমি বেগে ছুটবে ভারতের অত্যাধুনিক ‘B-28’ সুপারফাস্ট ট্রেন, জানুন এই প্রযুক্তির খুঁটিনাটি

নিজস্ব প্রতিবেদন (টেক ডেস্ক):
ভারতীয় রেলের ইতিহাসে একের পর এক প্রযুক্তিগত বিপ্লব ঘটে চলেছে। বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের (Vande Bharat Express) হাত ধরে ভারত ইতিমধ্যেই সেমি-হাইস্পিড ট্রেনের যুগে প্রবেশ করেছে। কিন্তু প্রযুক্তি তো আর এক জায়গায় থেমে থাকে না। এবার বন্দে ভারতের চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ গতিতে ছুটতে সক্ষম এক অত্যাধুনিক সুপারফাস্ট ট্রেন ট্র্যাকে নামানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারত সরকার। আধুনিক প্রযুক্তিতে মোড়া এই নতুন ট্রেনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘B-28’। রিপোর্ট অনুযায়ী, এই ট্রেনটি সর্বোচ্চ ২৮০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা (২৮০ km/h) বেগে ছুটতে পারবে। প্রযুক্তির দিক থেকে এটি ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি এক অবিশ্বাস্য মাস্টারপিস হতে চলেছে।

বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের সর্বোচ্চ গতিবেগ যেখানে ১৬০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা এবং প্রস্তাবিত বুলেট ট্রেনের গতিবেগ ৩২০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা, সেখানে এই ‘B-28’ ট্রেনটি এই দুই প্রযুক্তির মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে। চলুন জেনে নেওয়া যাক, কী এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে এই ট্রেনে যা একে এত দ্রুতগামী করে তুলেছে।

কীভাবে ২৮০ কিমি বেগে ছুটবে B-28? জানুন প্রযুক্তির ম্যাজিক
এই বিপুল গতিবেগে ট্রেন চালানোর জন্য সাধারণ স্টিল বা লোহার বডি ব্যবহার করা যায় না। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘B-28’ সুপারফাস্ট ট্রেনটির বডি সম্পূর্ণভাবে অত্যাধুনিক লাইটওয়েট অ্যালুমিনিয়াম (Lightweight Aluminum) অ্যালয় দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে ট্রেনের ওজন সাধারণ ট্রেনের তুলনায় অনেক কম হবে, যা দ্রুত গতি তুলতে সাহায্য করবে।

এছাড়া ট্রেনটির সামনের অংশ বা ‘নোজ’ (Nose)-এর ডিজাইন একদম বিমানের মতো অ্যারোডাইনামিক (Aerodynamic) রাখা হয়েছে। ২৮০ কিলোমিটার বেগে যখন ট্রেনটি ছুটবে, তখন বাতাসের প্রচণ্ড বাধাকে (Air Drag) অনায়াসে কেটে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করবে এই অ্যারোডাইনামিক ডিজাইন। এতে বিদ্যুৎ খরচও অনেকটাই কমবে।

ইঞ্জিনলেস প্রযুক্তি এবং রিজেনারেটিভ ব্রেকিং সিস্টেম
বন্দে ভারতের মতোই B-28 ট্রেনে কোনো আলাদা ইঞ্জিন বা লোকোমোটিভ থাকবে না। এটি ডিস্ট্রিবিউটেড পাওয়ার বা ইএমইউ (EMU) প্রযুক্তিতে চলবে। অর্থাৎ ট্রেনের প্রতিটি কামরার নিচেই শক্তিশালী ট্রাকশন মোটর (Traction Motors) লাগানো থাকবে, যা পুরো ট্রেনটিকে একসাথে সামনের দিকে ঠেলবে। এই প্রযুক্তির ফলে ট্রেনটি মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই শূন্য থেকে সর্বোচ্চ গতিতে পৌঁছে যেতে পারবে।

গতি যেমন বেশি, ব্রেকিং সিস্টেমও তেমনি শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। এর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে অত্যাধুনিক রিজেনারেটিভ ব্রেকিং সিস্টেম (Regenerative Braking System)। এই প্রযুক্তিতে চালক যখন ব্রেক কষবেন, তখন উৎপন্ন গতিশক্তি বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয়ে আবার ট্রেনের পাওয়ার গ্রিডে ফিরে যাবে।

ভেতরের পরিবেশ: বিমানের চেয়েও বিলাসবহুল
‘B-28’-এর ভেতরে পা রাখলে আপনার মনে হবে যেন কোনো ফাইভ-স্টার হোটেলের লাউঞ্জে বা বিমানের বিজনেস ক্লাসে ঢুকে পড়েছেন। যাত্রীদের আরামের জন্য এতে এরগোনমিক সিটিং (Ergonomic Seating) ব্যবস্থা থাকছে, যা দূরপাল্লার যাত্রায় কোনো ক্লান্তি আসতে দেবে না।

  • স্মার্ট ইনফোটেইনমেন্ট: প্রতিটি সিটের সামনে থাকবে টাচস্ক্রিন ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেম, যেখানে ফাইভ-জি ওয়াই-ফাইয়ের সাহায্যে হাই-স্পিড ইন্টারনেট ব্যবহার করা যাবে।
  • নয়েজ ক্যান্সেলেশন কেবিন: ট্রেনের ভেতরে সম্পূর্ণ নয়েজ-ফ্রি বা শব্দহীন পরিবেশ বজায় রাখতে বিশেষ অ্যাকোস্টিক গ্লাস (Acoustic Glass) এবং সাউন্ডপ্রুফিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।

নিরাপত্তায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও ‘কবচ’
এত বেশি গতিতে চলার জন্য সুরক্ষার বিষয়টি সবচেয়ে আগে মাথায় রেখেছে রেলওয়ে। এই ট্রেনে ভারতের নিজস্ব অ্যান্টি-কলিশন প্রযুক্তি ‘কবচ ২.০’ (Kavach 2.0) ইনস্টল করা থাকবে। একই ট্র্যাকে অন্য কোনো ট্রেন চলে এলে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই (AI) সেন্সর আগে থেকেই বিপদ বুঝে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইমার্জেন্সি ব্রেক কষবে। এছাড়া ট্রেনের চাকা এবং ট্র্যাকের অবস্থা প্রতি মুহূর্তে মনিটর করার জন্য আইওটি (IoT) সেন্সর বসানো থাকছে।

উপসংহার:
দেশের ব্যস্ততম রুটগুলোতে যাত্রার সময় প্রায় অর্ধেক করে দিতে ‘B-28’ সুপারফাস্ট ট্রেন এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে বা ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্পের অধীনে তৈরি এই ট্রেন প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং এবং প্রযুক্তিতে বিশ্বমঞ্চে ভারত আর পিছিয়ে নেই। খুব শীঘ্রই এই ট্রেনের ট্রায়াল রান শুরু হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top