নিজস্ব প্রতিবেদন (লাইফস্টাইল ডেস্ক):
বর্তমান যুগের কর্পোরেট কালচার বা ওয়ার্ক ফ্রম হোমের দৌলতে আমাদের দিনের বেশিরভাগ সময়টাই কাটে ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের স্ক্রিনের সামনে। ডেস্কে বসে একটানা ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা কাজ করা এখন যেন রোজনামচায় পরিণত হয়েছে। আর এই দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার ফলেই শরীরে বাসা বাঁধছে একাধিক সমস্যা। যার মধ্যে অন্যতম এবং সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা হলো, পা ফুলে যাওয়া বা ‘পেরিফেরাল এডিমা’ (Peripheral Edema)। অনেকেই কাজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় খেয়াল করেন যে জুতোটা যেন হঠাৎ করে পায়ের মাপের চেয়ে ছোট হয়ে গিয়েছে, বা পায়ে কেমন একটা ভারী ভাব অনুভূত হচ্ছে।
অনেকেই এই পা ফুলে যাওয়ার সমস্যাকে সাধারণ ক্লান্তি ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, দিনের পর দিন এই ঘটনা ঘটতে থাকলে তা ভবিষ্যতে গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হতে পারে। কেন দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে পা ফুলে যায় এবং কীভাবে এই সমস্যা থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব, চলুন তা বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
পা ফুলে যাওয়ার পেছনের আসল কারণ কী?
আমাদের পায়ের পেশিগুলি এক ধরণের পাম্পের মতো কাজ করে। আমরা যখন হাঁটাচলা করি, তখন এই পেশিগুলি সঙ্কুচিত ও প্রসারিত হয়ে রক্তকে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বিপরীতে শরীরের ওপরের দিকে অর্থাৎ হার্টের দিকে ঠেলে পাঠাতে সাহায্য করে। কিন্তু আমরা যখন একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেয়ারে পা ঝুলিয়ে বসে থাকি, তখন পায়ের পেশিগুলি নিষ্ক্রিয় থাকে। ফলে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে শরীরের রক্ত ও তরল পদার্থ পায়ের নিচের অংশে জমতে শুরু করে। রক্তনালী থেকে তরল বেরিয়ে চারপাশের টিস্যুতে জমা হওয়ার কারণেই পা, গোড়ালি বা পাতা ফুলে ঢোল হয়ে যায়।
এটি কি কোনও বড় রোগের পূর্বলক্ষণ হতে পারে?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে পা ফুলে যাওয়াটা খুব একটা চিন্তার বিষয় নয়। কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করলে বা রাতে পা উঁচু করে ঘুমালে সকালের মধ্যে এই ফোলা ভাব স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। কিন্তু যদি দেখা যায় যে বিশ্রাম নেওয়ার পরেও পা ফোলা কমছে না, বা ফোলার সাথে সাথে পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা, লালচে ভাব বা শ্বাসকষ্ট হচ্ছে তবে তা মোটেও সাধারণ বিষয় নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস (DVT) বা পায়ের শিরায় রক্ত জমাট বাঁধার মতো মারাত্মক রোগের লক্ষণ হতে পারে। এছাড়া কিডনি, হার্ট বা লিভারের সমস্যা থাকলেও পায়ে জল জমে ফুলে যেতে পারে। এমন লক্ষণ দেখলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
পা ফোলা থেকে মুক্তি পাওয়ার ৫টি অব্যর্থ উপায়:
যাদের কাজের প্রয়োজনে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে হয়, তারা নিজেদের দৈনন্দিন রুটিনে কিছু ছোট পরিবর্তন আনলেই এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারেন।
১. কাজের ফাঁকে ‘ব্রেক’ নেওয়া বাধ্যতামূলক: একটানা সিটে বসে থাকবেন না। প্রতি এক ঘণ্টা অন্তর অন্তত ৫ মিনিটের জন্য ডেস্ক ছেড়ে উঠুন। একটু হাঁটাচলা করুন, জল খান বা চা খেয়ে আসুন। এতে পায়ের পেশিগুলো সচল হবে এবং রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকবে।
২. ডেস্কে বসেই পায়ের ব্যায়াম: বসে থাকার সময়েই পায়ের পাতা ওপর-নিচ করুন। গোড়ালিকে ঘড়ির কাঁটার দিকে এবং বিপরীত দিকে গোল গোল করে ঘোরান (Ankle Rotation)। এতে পায়ের পেশিতে রক্ত জমাট বাঁধতে পারবে না।
৩. খাবারে লবণের পরিমাণ কমান: খাবারে অতিরিক্ত কাঁচা লবণ বা সোডিয়াম শরীরের কোষে জল ধরে রাখে (Water Retention), যা পা ফোলার অন্যতম প্রধান কারণ। তাই বাইরের প্রসেসড ফুড, ফাস্ট ফুড এবং ভাতে কাঁচা নুন খাওয়ার অভ্যাস আজই ত্যাগ করুন। পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে জল পান করুন, কারণ শরীর হাইড্রেটেড থাকলে টক্সিন সহজেই প্রস্রাবের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়।
৪. পা উঁচু করে বিশ্রাম নিন: বাড়িতে ফেরার পর অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট বিছানায় শুয়ে পায়ের নিচে দু’টো বালিশ দিয়ে পা দুটোকে বুকের লেভেল থেকে সামান্য উঁচুতে রাখুন। এতে পায়ের জমে থাকা তরল খুব দ্রুত হার্টের দিকে ফিরে যায় এবং ফোলা ভাব জাদুমন্ত্রের মতো কমে যায়।
৫. আরামদায়ক জুতো এবং কম্প্রেশন মোজা: অফিসে হাই হিল বা খুব টাইট জুতো পরা এড়িয়ে চলুন। পা ফোলার প্রবণতা বেশি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ‘কম্প্রেশন স্টকিংস’ (Compression Stockings) বা বিশেষ ধরনের মোজা পরতে পারেন, যা পায়ে হালকা চাপ সৃষ্টি করে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
উপসংহার:
কাজের চাপ আমাদের জীবনে থাকবেই, কিন্তু তার জন্য নিজের স্বাস্থ্যের সাথে আপস করা একেবারেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে পা ফুলে যাওয়াটা একটি সতর্কবার্তা মাত্র। আপনার শরীর আপনাকে বলছে যে এবার একটু বিরতি নেওয়ার সময় হয়েছে। তাই আজ থেকেই এই ছোট ছোট নিয়মগুলি মেনে চলা শুরু করুন এবং আপনার পা দুটিকে রাখুন একদম ফিট ও সতেজ।
