নিজস্ব প্রতিবেদন (জাতীয় ডেস্ক):
আজকের দিনে স্মার্টফোন ছাড়া এক মুহূর্তও চলা প্রায় অসম্ভব। সকালের ঘুম ভাঙা থেকে শুরু করে রাতের বেলায় ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত, পড়াশোনা, অফিস, বিনোদন সবকিছুর জন্যই আমাদের নির্ভর করতে হয় ইন্টারনেটের ওপর। আর এই সুযোগটাকেই কাজে লাগাচ্ছে দেশের শীর্ষস্থানীয় টেলিকম সংস্থাগুলি। সম্প্রতি রিলায়েন্স জিও, ভারতী এয়ারটেল এবং ভোডাফোন আইডিয়া (ভি)-এর মতো বেসরকারি টেলিকম কোম্পানিগুলি একযোগে তাদের প্রি-পেইড এবং পোস্ট-পেইড রিচার্জ প্ল্যানের দাম একধাক্কায় অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে কার্যত মাথায় হাত পড়েছে দেশের কোটি কোটি সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের।
কেন বারবার বাড়ছে রিচার্জের দাম?
বিশেষজ্ঞদের মতে, টেলিকম কোম্পানিগুলির এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে প্রধানত দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, ফাইভ-জি (5G) নেটওয়ার্ক। দেশজুড়ে ফাইভ-জি পরিষেবা চালু করতে এই কোম্পানিগুলিকে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছে। সেই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের টাকা এবার গ্রাহকদের পকেট থেকেই তুলে নিতে চাইছে তারা। দ্বিতীয়ত, এআরপিইউ (ARPU) বা ‘অ্যাভারেজ রেভিনিউ পার ইউজার’ বৃদ্ধি করা। টেলিকম কোম্পানিগুলির লক্ষ্য হলো প্রতিটি গ্রাহকের থেকে মাসিক আয়ের পরিমাণ অন্তত তিনশো টাকার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া। আর সেই লক্ষ্য পূরণের জন্যই নিত্যনতুন প্ল্যান এনে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দাম বাড়ানো হচ্ছে।
শেষ হলো সস্তায় ডেটার যুগ
একটা সময় ছিল যখন মাত্র কয়েক টাকায় প্রতিদিন এক বা দুই জিবি ডেটা পাওয়া যেত। ২০১৬ সালে জিও আসার পর থেকে ভারতবাসী কার্যত বিনামূল্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু সেই সুদিন এখন অতীত। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে সাধারণ ভ্যালিডিটি প্ল্যান, যা আগে একশো টাকার আশেপাশে ছিল, তা এখন বেড়ে প্রায় দুশো টাকার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। প্রতিদিন দেড় বা দুই জিবি ডেটার প্ল্যানগুলির দামও প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। যাদের পরিবারে তিন-চারটি স্মার্টফোন রয়েছে, মাসের শেষে তাদের শুধুমাত্র রিচার্জের পেছনেই মোটা অঙ্কের টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে।
গ্রাহকদের ক্ষোভ এবং বিএসএনএল-মুখী হওয়ার প্রবণতা
প্রাইভেট কোম্পানিগুলির এই লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়াতেও এই নিয়ে চলছে জোর চর্চা। অনেকেই মনে করছেন, টেলিকম সেক্টরে প্রাইভেট কোম্পানিগুলির একচেটিয়া আধিপত্যের কারণেই তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো দাম বাড়াতে পারছে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের কাছে একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারি টেলিকম সংস্থা বিএসএনএল। কারণ, বিএসএনএল-এর প্ল্যানগুলি এখনও প্রাইভেট কোম্পানিগুলির তুলনায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ সস্তা। ইতিমধ্যেই লক্ষ লক্ষ গ্রাহক জিও এবং এয়ারটেল ছেড়ে নিজেদের নম্বর বিএসএনএল-এ পোর্ট করতে শুরু করেছেন।
অতিরিক্ত খরচ থেকে বাঁচতে কী করবেন?
রিচার্জের দাম বাড়লেও ইন্টারনেট তো আর ব্যবহার করা বন্ধ করা যাবে না! তবে কিছু স্মার্ট কৌশল অবলম্বন করলে এই অতিরিক্ত খরচের হাত থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পাওয়া সম্ভব:
১. দীর্ঘমেয়াদী প্ল্যান বেছে নিন: প্রতি মাসে রিচার্জ করার বদলে তিন মাস (৮৪ দিন) বা এক বছরের (৩৬৫ দিন) প্ল্যানগুলি একসঙ্গে রিচার্জ করে নিন। মাসিক হিসেবে দেখলে এই প্ল্যানগুলিতে খরচ তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম পড়ে।
২. ফ্যামিলি পোস্ট-পেইড প্ল্যান: আপনার পরিবারে যদি তিন-চারজন সদস্য থাকে, তবে সবার জন্য আলাদা প্রিপেইড রিচার্জ না করে একটি ফ্যামিলি পোস্ট-পেইড প্ল্যান নিতে পারেন। এতে একটি বিলের মাধ্যমেই সবাই আনলিমিটেড কল ও ডেটা ব্যবহার করতে পারবেন, যা বেশ সাশ্রয়ী।
৩. ওয়াই-ফাই-এর ব্যবহার: বাড়িতে বা অফিসে ব্রডব্যান্ড বা ওয়াই-ফাই কানেকশন থাকলে মোবাইল ডেটার ব্যবহার কমিয়ে দিন। সে ক্ষেত্রে মোবাইলে শুধুমাত্র কলিং এবং সামান্য ডেটার একটি বেসিক প্ল্যান রিচার্জ করে রাখলেই কাজ চলে যাবে।
৪. ডেটা ট্র্যাক করুন: অপ্রয়োজনে ব্যাকগ্রাউন্ডে ডেটা খরচ হয় এমন অ্যাপগুলি বন্ধ রাখুন। সোশ্যাল মিডিয়ায় অটোপ্লে ভিডিও বন্ধ করে রাখলে অনেকটাই ডেটা বাঁচানো সম্ভব।
উপসংহার:
টেলিকম কোম্পানিগুলির এই মূল্যবৃদ্ধি আমজনতার পকেটে যে বড়সড় কোপ বসিয়েছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। যতদিন না সরকারি সংস্থা বিএসএনএল দেশজুড়ে তাদের ফাইভ-জি পরিষেবা সম্পূর্ণভাবে আপগ্রেড করতে পারছে, ততদিন প্রাইভেট কোম্পানিগুলির এই আধিপত্য কমার কোনও সম্ভাবনা দেখছেন না প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। এই পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের নিজেদেরই বুদ্ধি করে সঠিক রিচার্জ প্ল্যান বেছে নিতে হবে, যাতে খরচ সাধ্যের মধ্যে থাকে।
