নিজস্ব প্রতিবেদন (টেক ডেস্ক):
ভারতের স্মার্টফোনের বাজার বর্তমানে স্যামসাং, অ্যাপেল এবং ওপো, ভিভো বা শাওমির মতো চিনা কোম্পানিগুলির একচেটিয়া দখলে। কিন্তু যদি বলা হয়, এবার এই বিদেশি ব্র্যান্ডগুলিকে কড়া টক্কর দিতে স্মার্টফোনের দুনিয়ায় পা রাখতে চলেছে ভারতের সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং ঐতিহ্যবাহী শিল্প সংস্থা টাটা গ্রুপ? হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন। সম্প্রতি ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ‘এ-ওয়ান’ বা ‘A-1’ নামের একটি স্মার্টফোন বাজারে আনতে চলেছে টাটা গোষ্ঠী। এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই দেশজুড়ে টেকপ্রেমী থেকে শুরু করে আমজনতার মধ্যে শুরু হয়েছে প্রবল হইচই। কিন্তু সত্যিই কি টাটার নিজস্ব কোনো স্মার্টফোন বাজারে আসতে চলেছে, নাকি এটি শুধুই একটি জল্পনা? আনন্দবাজারের একটি প্রতিবেদন ও বর্তমান টেক দুনিয়ার ট্রেন্ডের ওপর ভিত্তি করে চলুন জেনে নেওয়া যাক আসল সত্যিটা।
টাটার স্মার্টফোন নিয়ে জল্পনার সূত্রপাত কোথায়?
গত কয়েক বছর ধরেই টেলিকম এবং ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরে বড়সড় বিপ্লব আনছে টাটা। কিন্তু নিজস্ব স্মার্টফোনের বিষয়টি প্রথম সামনে আসে সোশ্যাল মিডিয়ার কিছু ভাইরাল পোস্ট থেকে। সেখানে দাবি করা হয়, টাটা গ্রুপ ফ্ল্যাগশিপ লেভেলের স্ন্যাপড্রাগন প্রসেসর, হাই-রেজোলিউশন ক্যামেরা এবং ১২ জিবি র্যাম সমেত একটি প্রিমিয়াম স্মার্টফোন লঞ্চ করতে চলেছে, যার নাম রাখা হয়েছে ‘টাটা এ-ওয়ান’ বা টাটা ফোন ১। বলা হচ্ছে, এই ফোনের দাম হতে পারে ৫০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকার মধ্যে, যা সরাসরি টেক্কা দেবে অ্যাপেলের আইফোন এবং স্যামসাংয়ের গ্যালাক্সি সিরিজের প্রিমিয়াম ফোনগুলিকে। শুধু তাই নয়, লিক হওয়া তথ্যে এও বলা হয়েছে যে এই ফোনটির বডি হবে গ্লাস ও মেটালের তৈরি, যা দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হবে।
বিশ্লেষকরা কী বলছেন? গুজব নাকি সত্যি?
গ্যাজেট বিশ্লেষক এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশের মতে, টাটা গোষ্ঠী যদি সত্যিই নিজস্ব স্মার্টফোন নিয়ে বাজারে আসে, তবে স্যামসাং বা অ্যাপেলের মতো বিদেশি ব্র্যান্ডগুলিকে ভারত থেকে পাততাড়ি গোটাতে হতে পারে। কারণ, ভারতীয়দের মনে টাটা কোম্পানির প্রতি একটি আলাদা আবেগ ও অন্ধ বিশ্বাস রয়েছে। কিন্তু, বাস্তব পরিস্থিতি একটু ভিন্ন। টাটার তরফ থেকে এখনও পর্যন্ত নিজস্ব কোনো স্মার্টফোন লঞ্চ করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়নি।
টেক বিশেষজ্ঞদের একাংশ টাটার এই ভারতীয় স্মার্টফোন তৈরির খবরকে আপাতত ‘গুজব’ বা ‘কনসেপ্ট’ বলেই উড়িয়ে দিচ্ছেন। তাঁদের মতে, স্মার্টফোন বাজারের প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র। এখানে শুধু ভালো হার্ডওয়্যার থাকলেই হয় না, সফটওয়্যার বা অপারেটিং সিস্টেমের দিক থেকেও ইউজারদের সেরা অভিজ্ঞতা দিতে হয়। এই মুহূর্তে টাটা সরাসরি কোনো ফোন বিক্রি করার বদলে স্মার্টফোনের ভেতরের যন্ত্রাংশ এবং সেমিকন্ডাক্টর তৈরির দিকেই বেশি নজর দিচ্ছে। ইলন মাস্কের ‘টেসলা পাই’ ফোন নিয়ে যেমন একসময় গুজব রটেছিল, টাটার এই ফোনটিকেও অনেকেই সেই একই ক্যাটেগরিতে ফেলছেন।
টাটার আসল গেমপ্ল্যান: আইফোন তৈরি এবং সেমিকন্ডাক্টর
টাটা হয়তো এখনই নিজেদের নামের কোনো ফোন বাজারে আনছে না, কিন্তু আপনারা জেনে অবাক হবেন যে, আপনি আগামী দিনে যে আইফোনটি ব্যবহার করবেন, তা হয়তো টাটার কারখানাতেই তৈরি হবে! হ্যাঁ, সম্প্রতি টাটা ইলেকট্রনিক্স ভারতে অ্যাপেলের আইফোন অ্যাসেম্বল বা যন্ত্রাংশ জুড়ে আইফোন তৈরির বড় দায়িত্ব পেয়েছে। বেঙ্গালুরুর কাছে তাইওয়ানের কোম্পানি উইস্ট্রনের কারখানা অধিগ্রহণ করার পর সেখানে জোরকদমে চলছে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ আইফোন তৈরির কাজ।
পাশাপাশি, ভারত সরকারের সহায়তায় টাটা গ্রুপ গুজরাটের ধোলেরা এবং অসমে বিশাল সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ তৈরির কারখানা স্থাপন করছে। কয়েক হাজার কোটি টাকার এই প্রজেক্টের মাধ্যমে কোয়ালকমের মতো বিশ্বমানের কোম্পানির সাথে চুক্তি করে ভবিষ্যতে হয়তো বিশ্বের তাবড় তাবড় মোবাইল ব্র্যান্ডের ভেতরে থাকবে টাটার তৈরি চিপ বা প্রসেসর।
ভবিষ্যতে কি টাটা নিজস্ব ফোন আনবে?
ভবিষ্যতের কথা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টাটা বর্তমানে তাদের ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের ভিত্তি মজবুত করছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তারা যদি সত্যিই ‘টাটা ফোন’ বাজারে আনে, তবে সেটি ভারতের বাজারে গেম-চেঞ্জার হতে পারে। টাটার নিজস্ব সুপার অ্যাপ ‘টাটা নিউ’-এর ইকোসিস্টেম এবং সম্পূর্ণ দেশীয় সার্ভারে ডেটা সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি গ্রাহকদের কাছে ডেটা সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় স্বস্তি এনে দেবে।
উপসংহার:
টাটা এ-ওয়ান স্মার্টফোন লঞ্চের খবরটি এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে একটি কল্পনা বা সোশ্যাল মিডিয়ার হাইপ মাত্র। তবে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ মেকানিজমে টাটা যে গতিতে কাজ করছে, তাতে আগামী দিনে ভারতের নিজস্ব ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোন বাজারে এলে খুব একটা অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আপাতত, টাটা যদি কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করে, তবে সেটি নিঃসন্দেহে ভারতের টেক দুনিয়ায় এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হবে।
